শিল্পকলা একাডেমিতে দুর্নীতি: নৃত্যে যত বেতাল

ডান্স এগেইনস্ট করোনা’ কর্মসূচির আওতায় ৭৫ নৃত্য পরিচালক ১০ মিনিটের ৭৫টি খণ্ডনৃত্যের কোরিওগ্রাফি-ভিডিও ধারণ করবেন। এর জন্য নৃত্যদলের সম্মানী বাবদ ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া হার্ডডিস্ক ক্রয়, ডকুমেন্টেশন, প্রপস-কস্টিউম, প্রচার ও বিবিধ ব্যয় ধরা হয়েছে আরও ২১ লাখ ৫১ হাজার ২৪৪ টাকা। সব মিলিয়ে ৯১ লাখ ৫১ হাজার ২৪৪ টাকা; যে টাকার পুরোটাই গত ৩০ জুন তারিখের ওপেন চেক করে রাখা হয়েছে।

উপ-সচিব (প্রশাসন) জাকির হোসেন বলছেন, ৩০ তারিখের চেক করা হলেও মেয়াদ ৬ মাস থাকে। কর্মকর্তাদের অগ্রিমে ওপেন চেক দেওয়া হয়, কেননা তারা সমন্বয় করতে বাধ্য থাকেন।

শিল্পীরা কি প্রস্তুত?

নৃত্য পরিচালকদের সঙ্গে দুদফা জুম মিটিং করেছে একাডেমি। জেলা পর্যায়ের ২৫টি গ্রুপের সঙ্গে (প্রত্যেকের বাজেট ৮০ হাজার) গত ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় মিটিং হয়। আর ঢাকার ৫০টি গ্রুপের পরিচালকদের সঙ্গে মিটিং হয় (প্রত্যেকের বরাদ্দ ১ লাখ করে) ২১ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায়। শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে। তবে এই টাকায় স্ক্রিপ্ট, মিউজিক, কস্টিউম সম্ভব নয়। কবে নাগাদ কাজ জমা দিতে হবে সেটাও স্পষ্ট নয়। তবে কয়েকজন ছাড়া বাকিরা কাজটি করতে আগ্রহী বলে জানান তারা।

নৃত্য পরিচালকদের কেউ কেউ জানান, জুমে কথা হওয়ায় তারা বরাদ্দের পরিমাণ বুঝতে পারেননি। আর বিভিন্ন কারণে প্রস্তুতি নেওয়াও শুরু করতে পারেননি তারা।

বাংলাদেশ ব্যালেড গ্রুপের আমানুল হক বলেন, ‘এই কর্মসূচির কথা শুনেছি। কথাবার্তা চলছে। চূড়ান্ত কিছু জানায়নি। এক লাখ টাকা দেওয়া হবে। সেই টাকা দিয়ে কস্টিউম, মিউজিক লাইট এবং শিল্পীদের পেমেন্ট দিতে হবে বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়। এই বরাদ্দে এই ভিডিও ধারণ প্রায় অসম্ভব একটা বিষয়। কিন্তু আমরা যারা শিল্পকলার সঙ্গে জড়িত তারা কাজ করি মন থেকে; এভাবেই করতে হবে।’

পল্লভী ডান্স থিয়েটারের মিনু হক জানান, সম্প্রতি তার চোখে অপারেশন হয়েছে বলে তিনি কোনও কাজই শুরু করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমি ঠিক বিষয়গুলো এখনও শুরু করতে পারিনি। তবে ওরা বলেছে এক লাখ টাকা বাজেটে করতে হবে। এটা কীভাবে সম্ভব? আমি সুস্থ হয়ে সমন্বয়ক ও মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলবো। তারা নিশ্চয়ই সহযোগিতা করবেন।’

পূজার পরে বিস্তারিত জানাতে পারবো উল্লেখ করে নৃত্যনন্দনের শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিটিংয়ের দিন লাইন খুব ডিসটার্ব করছিল। ঠিকমতো সব শুনতে পারিনি। এখনও কাজ শুরু করিনি। তবে যা বরাদ্দ দেওয়া হবে তার মধ্যে সব ব্যবস্থা করতে হবে জানানো হয়েছে।’

দিব্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের দীপা খন্দকার বলেন, ‘১০ মিনিটের একটি নৃত্য, মিনিমাম ১০ জন শিল্পী নিয়ে করতে হবে। ১ লাখ টাকা বাজেট। এখনও চূড়ান্ত নয়। অনেকে জানতে চাইছে, মিউজিকটা তৈরিতে শিল্পকলা কোনও সাহায্য করবে কিনা। বাকি সব ওই বাজেটেই। বাজেটটা কম হয়ে যায়। কিন্তু করোনার মধ্যে তেমন কাজ পাওয়া যায়নি বলেই হয়তো অনেকে রাজি হয়েছেন এই বাজেটে কাজ করতে।’

২১ লাখের বরাদ্দ কেন?

৩০টি হার্ডডিস্ক ক্রয়, ডকুমেন্টেশন ব্যয়, প্রপস ও কস্টিউম বাবদ ব্যয়, প্রচার বাবদ ব্যয় ও বিবিধ ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ লাখ ৫১ হাজার ২৪৪ টাকা। শিল্পীদের দেওয়া ৮০ হাজার ও এক লাখের মধ্যেই সব করতে হবে বলা হয়। প্রশ্ন ওঠে, এই আলাদা করে বরাদ্দ কোথায় খরচ হবে? প্রপস ও কস্টিউমের কথা উল্লেখ করে শামীমা আক্তার জাহানের নামে চেক হয়েছে ৭ লাখ টাকার। শিল্পী দলগুলোকে জানানো হয়েছে তাদের প্রপস ও কস্টিউমের ব্যবস্থা করতে হবে বরাদ্দ এই টাকার মধ্যেই। তাহলে ৭ লাখ টাকার কস্টিউম কার জন্য? জানতে চাইলে শামীমা বলেন, ‘আমার নামে চেক হয়েছে শুনেছি। আমার নাম কেন ব্যবহার হলো জানি না। এরকম কোনও চেক আমার হাতে আসেনি।’

৩০ জুন উপস্থাপিত বরাদ্দের প্রস্তাবে লেখা হয়—৭০ লক্ষ টাকা নৃত্যদলগুলোর সম্মানীর ক্ষেত্রে নথিতে সংযুক্ত তালিকা অনুযায়ী নৃত্যদলসমূহকে চেকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হবে। এছাড়া ৩০টি হার্ডডিস্ক ক্রয়, ডকুমেন্টেশন ব্যয় ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা বিভাগের প্রোগ্রাম অফিসার জনাব মুহাম্মদ আনিসুর রহমান এর অনুকূলে, প্রকাশনা ও প্রমো নির্মাণ ব্যয় ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা সহকারী পরিচালক (নৃত্য) সামিনা হোসেন প্রেমার অনুকূলে, প্রপস ও কস্টিউমের ব্যয় ৭ লাখ টাকা বিভাগের উপ-পরিচালক শামীমা আক্তার জাহানের অনুকূলে এবং প্রচার ও বিবিধ ব্যয় ৩ লাখ ৫১ হাজার ২৪৪ টাকা বিভাগের সংগীত পরিচালক চন্দন দত্তর অনুকূলে অগ্রিম প্রদানের জন্য উপশিট ও বিল ফরম পূরণ করে নথি উপস্থাপন করেন বিভাগের সহকারী পরিচালক সামিনা হোসেন প্রেমা। একই দিনে একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী নির্ধারিত নীতিমালার ভিত্তিতে অনুমোদিত তালিকা অনুযায়ী যথাযথ নিয়ম নিশ্চিত করে বিভাগের প্রস্তাব অনুমোদন করা যায় মর্মে নোট লিখে স্বাক্ষর করেন। যদিও বিভাগের পরিচালক কাজী আফতাব উদ্দিন হাবলু বলছেন, তিনি এসব বিষয়ে স্পষ্ট অবগত নন। 

বিভাগের সূত্র জানায়, ৩০ জুন ৭৯টি চেক ইস্যু হয়। ৭৫টি নৃত্যসংগঠনের বাইরে চন্দন দত্ত (চেক নং ২৬৬৭১৩০), আনিসুর রহমান (চেক নং ২৬৬৭১২৯), সামিনা হোসেন (চেক নং ২৬৬৭১২৮), শামীমা আক্তার জাহানের (চেক নং ২৬৬৭১২৭) নামে চেক হয়। সবগুলোতেই স্বাক্ষর আছে বিতর্কিত সচিব মাহবুবা করিমের (মিনি করিম)। সবগুলোই ওপেন চেক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, শিল্পী সংগঠনের নামে কখনই ওপেন চেক হওয়ার সুযোগ নেই। কেন ওপেন চেক ইস্যু হলো, সেটা নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা শুরু হওয়ায় এখন সেগুলো অ্যাকাউন্ট পে চেক বানানোর চেষ্টা চলছে।

‘ডান্স এগেইনস্ট করোনা’ প্রকল্পটি সমন্বয়ের কাজ করছেন সহকারী পরিচালক সামিনা হোসেন প্রেমা। এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই নৃত্য পরিচালকদের সাথে কথা হচ্ছিল। করোনাকালে তারা কাজ করতে পারেননি। এই কাজের সিদ্ধান্ত আমি নেইনি। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে আমি ব্যবস্থাপনার কাজটি করছি। উদ্যোগটা আমার ভালো লেগেছে। কাজ করে তারা যদি এক লাখ টাকা পায় তাহলে সমস্যা কী? কোন কাজ হবে বা হবে না সেটা তো আমার সিদ্ধান্ত না।

শিল্পকলা একাডেমিতে সম্প্রতি নানা বিষয়ে দুর্নীতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে তার ভাষ্য, আরও অনেক প্রতিষ্ঠানেই অনিয়ম হচ্ছে, কিন্তু তা প্রকাশ পাচ্ছে না। এটা প্রকাশ পাচ্ছে, কারণ কেউ ইনটেনশনালি করছে। 

যাদের নামে চেক ইস্যু হলো, কিন্তু নানা কারণে কাজটা করতে পারবেন না; সেই চেকের কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা অর্থ বিভাগ জানে। এটা আমার দায়িত্ব না।

তথ্য সুত্রঃবাংলা ট্রিবিউন।

;