স্টাডি সেন্টারে ৪০ লাখ টাকা টিউশন ফি, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ ইউজিসির


দেশে স্টাডি সেন্টারের আড়ালে ‘মোনাশ কলেজে’র নামে শাখা ক্যাম্পাস চালাচ্ছে ইউনিভার্সাল কলেজ বাংলাদেশ (ইউসিবি)। এক বছর লেখাপড়া করিয়ে ক্রেডিট ট্রান্সফারের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। বলা হচ্ছে, মোনাশ ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলিয়া বা মালয়েশিয়ায় সরাসরি দ্বিতীয় বর্ষে লেখাপড়ার সুযোগও দেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে ইউজিসির কাছ থেকে কোনও অনুমোদন নেয়নি ইউনিভার্সাল কলেজ বাংলাদেশ।

শুধু তাই নয়, প্রথম বছরের পরীক্ষায় কোনও শিক্ষার্থী যদি উত্তীর্ণ না হন, তবে মোনাশে ভর্তি না করিয়ে তাকে বিশ্বের ‘অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে’ ভর্তির অফারও দিয়েছে তারা।

 এ বিষয়ে জানতে চেয়ে ইউনিভার্সাল কলেজ বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছে ইমেইলে কিছু প্রশ্ন  পাঠালে উত্তরে তারা দ্ব্যর্থবোধক অনেক তথ্যও দিয়েছে। তারা এও বলেছে, স্টাডি সেন্টারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষার জন্য সহায়তা করা হয়। স্টাডি সেন্টার কোনও পাঠ্যক্রমও নির্ধারণ করে না।
অথচ আবার তারাই বলেছে, এক বছর পর ক্রেডিট ট্রান্সফার করে শিক্ষার্থীরা অস্ট্রেলিয়া বা মালয়েশিয়ায় মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হতে পারবেন।

এতে পরিষ্কার হয় যে, মোনাশ স্টাডি সেন্টারের নামে ইউসিবি মূলত বাংলাদেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনহীন শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। এরইমধ্যে ৪২ জন শিক্ষার্থীও ভর্তি নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

মোনাশ স্টাডি সেন্টারে ভর্তি হওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, দেশে এক বছর মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ে পড়ানো হবে তাদের। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তিন বছরের জন্য ৪০ লাখ টাকা করে শুধু টিউশন ফি নিচ্ছে ইউসিবি। ডিপ্লোমাসহ তিন বছরের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি নেওয়া হয়েছে। দেশে এক বছর পড়া শেষে সরাসরি অস্ট্রেলিয়া বা মালয়েশিয়ায় গিয়ে মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দ্বিতীয় বর্ষে লেখাপড়া করা যাবে, ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের এমনটাই বলেছে  ইউসিবি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-ইউজিসি বলছে, কোনও স্টাডি সেন্টারের এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলানোর কোনও এখতিয়ার নেই। দ্রুত বন্ধ করে দিয়ে এই  স্টাডি সেন্টারের বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ ধরনের অনুমোদনহীন অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী স্টাডি সেন্টারের শিক্ষার্থীরা ঝুঁকিতে পড়লে তার কোনও দায় নেবে না ইউজিসি।

ইউসিবি’র মিডিয়া রিলেশনস থেকে লিখিতভাবে জানানো হয়, শিক্ষার্থীরা এক বছর পর মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে না পারলেও, তাদের অন্য কোনও আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় বা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ করা দেওয়া হবে। তবে এক বছরের পড়ালেখা করার পর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে বিশ্বের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন প্রক্রিয়ায় তারা ভর্তির সুযোগ করে দেবে, তা নিয়ে বিস্তারিত জানায়নি ইউসিবি। এতে করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ টিউশন ফি, কিংবা তাদের শিক্ষাজীবন ঝুঁকিতে পড়লো কিনা—এমন প্রশ্নের কোনও উত্তর দেয়নি ইউসিবি।

স্টাডি সেন্টারে কী পড়ানো হচ্ছে, বাংলাদেশে যা পড়ানো হচ্ছে, তা বিদেশে পাড়ানো হবে কিনা— এসব জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ইউসিবি’র ক্লাসে যোগদানের পর কোনও শিক্ষার্থী একবার যখন মোনাশে প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, তখন তিনি মোনাশ ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলিয়া বা মোনাশ ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ায় (শিক্ষার্থীর পছন্দ অনুযায়ী) সরাসরি দ্বিতীয় বর্ষে যোগ দিতে পারবেন।

ইউসিবি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্ববিরোধী কথাও বলেছে। একবার বলছে, এক বছর দেশে পড়ার পর সরাসরি মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্ট্রেলিয়া বা মালয়েশিয়ার ক্যাম্পাসে দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হওয়া যাবে, আবার বলছে— ক্রেডিট ট্রান্সফার করা হয় না। আবার এও বলেছে, কেউ এক বছরের লেখাপড়ায় উত্তীর্ণ না হলে বিদেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়া হবে। ইউসিবি নিজেদেরকে স্টাডি সেন্টার বা প্রস্তুতির জন্য সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাবি করলেও সরাসরি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সুযোগ দেওয়া কীভাবে সম্ভব—সেটার কোনও ব্যাখ্যা নেই মোনাশের লিখিত বক্তব্যে। 

বাংলাদেশে বসেই সরাসরি মোনাশ কলেজে ভর্তি হওয়া যাচ্ছে কিনা, জানতে চাইলে ইউনিভার্সাল কলেজ বাংলাদেশ (ইউসিবি) জানায়, তাদের এখানে অধ্যয়নের পর শিক্ষার্থীরা একবার মোনাশের চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে, তারা নিশ্চিতভাবে মোনাশ ইউনিভার্সিটি অস্ট্রেলিয়া বা মোনাশ ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়ায় ভর্তির সুযোগ পাবেন।

এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন—এটি দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে উপহাসের শামিল। কারণ, স্টাডি সেন্টারের নামে মোনাশের শিক্ষাক্রম পরিচালনা করা একদিকে যেমন মূল আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, অপরদিকে পর্যাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিকভাবে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে স্টাডি সেন্টারকে এ ধরনের ‘এক বছরের’ শিক্ষাক্রম পরিচালনার সুযোগ করে দেওয়া মানেই দেশের উচ্চশিক্ষাকে তাচ্ছিল্য করা।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আলমগীর বলেন, ‘সার্বিকভাবে বিষয়টি নিয়ে ইউজিসি বিব্রত। ২০১৪ সালের বিধিমালাটি চূড়ান্ত হওয়ার আগে স্টাডি সেন্টার সংক্রান্ত কার্যক্রম চালাতে প্রকৃতপক্ষে আগ্রহী না ইউজিসি। বর্তমানে মন্ত্রণালয় একটি স্টাডি সেন্টার খোলার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু এর অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম খোলার অনুমতি বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী কেবল ইউজিসি দিতে পারে। কিন্তু ইউজিসি তাদেরকে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালানোর কোনও অনুমতি দেয়নি। তারা যদি শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে থাকে, সেটা ইউজিসির অজ্ঞাতে হচ্ছে। ইউজিসি এর দায় ভার নেবে না। এক অর্থে বলা যায়, এই কর্মকাণ্ড অবৈধ। শিক্ষার্থীদেরকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার দায়-দায়িত্ব ওই স্টাডি সেন্টারকেই নিতে হবে।’  তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে সরকারের দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে। যেহেতু তাদের অ্যাকাডেমিক কর্মকাণ্ড চালানোর অনুমোদন নেই, সেহেতু অবৈধ কর্মকাণ্ড দ্রুত বন্ধ করতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’

কোনও স্টাডি সেন্টার ক্রেডিট ট্রান্সফার করতে, কিংবা প্রথম বর্ষ পড়িয়ে দ্বিতীয় বর্ষে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে পারে কিনা, জানতে চাইলে ড. আলমগীর বলেন, ‘স্টাডি সেন্টার ক্রেডিট ট্রান্সফার করতে পারে না, ক্রেডিটের কোনও বৈধতা নেই। যে প্রতিষ্ঠান ডিগ্রি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, সেই প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট ট্রান্সফার করতে পারে। স্টাডি সেন্টার যেহেতু শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না, সেহেতু ক্রেডিট ট্রন্সফার করতে পারবে না। স্টাডি সেন্টারের ক্রেডিট ট্রান্সফারের ক্ষমতা থাকতে পারে না। আইন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীকে দ্বিতীয় বর্ষে নিতে পারে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়, কোনও স্টাডি সেন্টার নয়।’

ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ এ বিষয়ে বলেন, ‘স্টাডি সেন্টার খোলার অনুমতি নিয়েছে,কিন্তু অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরুর অনুমতি নেয়নি।  তারা যে শর্তে স্টাডি সেন্টার অনুমোদন পেয়েছে, সেই শর্তে লেখা আছে— অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরু করতে ইউজিসির অনুমতি নিতে হবে। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালাতে তারা তো আবেদনই করেনি। কারণ   অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের অনুমোদন যে পাবে না, সেটা তারা জানে। সে কারণে এর ধারেকাছেও আসেনি। স্টাডি সেন্টার আইনে নেই, সেটাও তারা জানে।’

বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন বলেন, ‘আমরা আগেই বলেছিলাম, স্টাডি সেন্টারের অনুমোদন দিলে সার্টিফিকেট বাণিজ্য হবে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের বিধিমালাটি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় মন্ত্রণালয় এ নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ওই কমিটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদন দাখিলের পর ওই বছরের মার্চে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে কমিটি যে সুপারিশ করেছে, তা সংশোধন করে ফের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হয়। এরপর বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে আজও  তা চূড়ান্ত হয়নি।

আর ওই পরিস্থিতির মাঝেই চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্টাডি সেন্টার পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমতি পাওয়ার পর ইউজিসির কাছ থেকে শিক্ষা কার্যক্রমের অনুমোদন না নিয়েই শিক্ষার্থী ভর্তি করে মোনাশ স্টাডি সেন্টার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন খালি থেকে যাচ্ছে। করোনাকালে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে। অথচ স্টাডি সেন্টারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এই সংকটের মধ্যেই। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যবসা করার সুযোগ দিতে এটি করা হয়েছে বলে অভিযোগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতিসহ সংশ্লিষ্টদের।

তথ্য সুত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন।

;