পণ্য পরিবহন আমূল বদলে দিয়েছে কনটেইনার


আধুনিক যুগে মানুষ সারা দিনে যত পণ্য ব্যবহার করে, তার একটি বড় অংশই সমুদ্রপথে পরিবহন হয়। ধরা যাক, আপনি কম্পিউটারের পর্দায় কাজ করছেন, হাতে কফির মগ, এসব কিছুই কিন্তু ভিন্ন কোনো দেশ থেকে আসছে। শুধু এগুলো নয়, আধুনিক জীবনের অন্যান্য অনুষঙ্গ যেমন রেফ্রিজারেটর, স্মার্টফোন, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র—এসবই কোনো না কোনো দেশ থেকে আসছে। যেসব দেশে এসব উৎপাদিত হচ্ছে, সেখানেই যে তার সব যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে, তা নয়। অর্থাৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোও অন্য দেশ থেকে এসব আমদানি করছে। আর এসব পণ্য পরিবহন হচ্ছে মূলত সমুদ্রপথে।

বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্যই সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়, ফল থেকে শুরু করে গেজেট, ইলেকট্রনিক অ্যাপ্লায়েন্স—সবকিছুই। বিশ্বের এক প্রান্তের বন্দরে এসব জিনিস বড় কনটেইনারে ভরে পণ্যবাহী জাহাজে তোলা হয়। আবার তেল ও শস্যের মতো পণ্যের জন্য কনটেইনার দরকার হয় না; সরাসরি জাহাজে তোলা হয় এসব। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক ব্লগপোস্টে বলা হয়েছে, প্রতিবছর প্রায় ১৪ লাখ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য বড় বড় ধাতব কনটেইনারে পরিবাহিত হয়। এই কনটেইনার ছাড়া আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা একরকম মুখ থুবড়ে পড়ত।

কনটেইনারের গুরুত্ব যে কী, সাম্প্রতিক সংকটেই তা বোঝা গেল। কনটেইনারের সংকট সৃষ্টি হওয়ার কারণে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। বাড়ছে আমদানি করা পণ্যের দাম।

মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সমরাস্ত্র পরিবহনের জন্য মার্কিন সেনাবাহিনী কনটেইনার পরিবহন শুরু করে। তবে সেই কনটেইনার ছিল আকারে ছোট। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে মার্কিন ব্যবসায়ী ম্যালকম ম্যাকলিন বুঝতে পারেন, প্রমাণ আকারের কনটেইনার তৈরি করা গেলে জাহাজ বা ট্রেনে কনটেইনার ওঠানো-নামানো অনেক সহজ হবে। এই পদ্ধতিতে পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সরবরাহ পর্যন্ত পুরো সময় কনটেইনারে রাখা যায়। এতে খরচ অনেকটাই কমে যায়—ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও কমে আসে।

এই বাস্তবতায় ১৯৫৬ সালে ম্যাকলিন প্রমাণ আকারের কার্গো কনটেইনার তৈরি করেন। এখনো সেই আকারের কনটেইনার চলছে। তাঁর তৈরি কনটেইনারের দৈর্ঘ্য ছিল ৩৩ ফুট, শিগগিরই তা বাড়িয়ে ৩৫ ফুট করা হয়, প্রশস্ততা ও উচ্চতা নির্ধারণ হয় আট ফুট। এই পদ্ধতির কারণে কনটেইনার পরিবহনের খরচ নাটকীয়ভাবে কমে আসে। ১৯৫৬ সালে কায়িক শ্রমের মাধ্যমে যেভাবে কনটেইনার ওঠানো–নামানো হতো, তাতে প্রতি টনে খরচ পড়ত ৫ দশমিক ৮৬ ডলার। কনটেইনার প্রমাণ আকার পাওয়ার কারণে খরচ কমে দাঁড়ায় টনপ্রতি ১৬ সেন্ট। এই পদ্ধতিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কমে এল। কনটেইনার তালাবদ্ধ থাকায় চাইলেই কেউ চুরি করতে পারে না। আবার এত বড় আকারের কনটেইনার জলদস্যুদের পক্ষেও নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাবাহিনী এই কনটেইনারের চূড়ান্ত ব্যবহার করেছে। এখন অবশ্য ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনার বেশি ব্যবহৃত হয়। সেই সঙ্গে ৪০ ফুটের কনটেইনারও আছে। তবে তাদের প্রশস্ততা সমান। এতে সুবিধা হলো, কনটেইনারগুলো জাহাজের ভেতরে একদম খাপে খাপে এঁটে যায়, মাঝখানে খালি জায়গা থাকে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বায়নের পালে হাওয়া লাগে, তার অন্যতম কারণ ছিল এই কনটেইনার। ১৯৮০ সালে যেখানে কনটেইনারে পরিবাহিত পণ্যের পরিমাণ ছিল ১০২ মিলিয়ন মেট্রিক টন, ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৩ কোটি মেট্রিক টন। অধিকাংশ কনটেইনার প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পরিবাহিত হয়।

অন্যদিকে কনটেইনারবাহী জাহাজের দৈর্ঘ্যও গত ২০ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। এখন বিশ্বের বৃহত্তম জাহাজের ধারণক্ষমতা ২৪ হাজার কনটেইনার। অন্য কথায়, মালগাড়ি বা কনটেইনারবাহী ট্রেনের দৈর্ঘ্য ৪৪ মাইল হলেই কেবল এত পরিমাণ কনটেইনার পরিবহন করা সম্ভব—চাট্টিখানি কথা নয়। আরেক হিসাব দেওয়া যাক, ২০ ফুট আকৃতির ১৯ হাজার ১০০ কনটেইনার পরিবহনে সক্ষম একটি জাহাজ ১৫ কোটি ৬০ লাখ জোড়া জুতা, ৩০ কোটি ট্যাবলেট কম্পিউটার, ৯০ কোটি ক্যান বিন পরিবহন করতে সক্ষম।

চলতি বছরের মার্চ মাসে এভার গিভেন নামের যে জাহাজ সুয়েজ খালে এক সপ্তাহ আটকে ছিল, তার সক্ষমতা ছিল ২০ হাজার কনটেইনার।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো খরচ, ২০ টনের একটি কনটেইনার ইউরোপ থেকে এশিয়ায় পাঠানোর খরচ একই পথে ইকোনমি ক্লাসের একটি বিমান টিকিটের সমান। এটা অবশ্য মহামারির আগের হিসাব। মহামারির মধ্যে নানা সংকটের কারণে কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া বেড়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে কনটেইনারের ভাড়া বৃদ্ধিকে দায়ী করা হচ্ছে।

তথ্য সুত্রঃ প্রথম আলো। 

;