কিছুই তোয়াক্কা করছেন না শিল্পকলার ডিজি

শিল্পকলা একাডেমির পরিষদের সদস্যদের সিদ্ধান্ত, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ- কিছুই তোয়াক্কা করছেন না শিল্পকলার মহাপরিচালক (ডিজি) লিয়াকত আলী লাকী। ইচ্ছেমতো বদলি, পরিষদকে না জানিয়ে অফিস আদেশ দেওয়া, অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয়; এরকম বহু গুরুতর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। একাডেমি পরিষদের জ্যেষ্ঠ সদস্যরাই তুলে এনেছেন এসব অভিযোগ।

২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল লিয়াকত আলী লাকীকে ষষ্ঠবারের মতো তিন বছর মেয়াদে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগের দফাগুলোতে দুই বছর করে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আগের চুক্তি অনুযায়ী সে বছরই ১০ এপ্রিল তার মেয়াদ শেষ হয়।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন হলেও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিল্পকলা একাডেমি চলে নিজস্ব আইনে। পাশাপাশি একাডেমির প্রশাসনিক কার্যক্রম নির্ধারিত হয় পরিষদের মাধ্যমে। ২৫ সদস্যবিশিষ্ট এই পরিষদের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করেন পরিষদের সদস্য সচিব হিসেবে নিযুক্ত একাডেমির মহাপরিচালক।

১৯৮৯ সালে প্রণীত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আইন অনুযায়ী কাউকে বদলি করতে হলে সেটি পরিষদ সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হবে এবং একাডেমির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তা বাস্তবায়ন করবেন মহাপরিচালক।

সিন্ডিকেটে টান লাগায় আপত্তি?

অভিযোগ আছে, কিছু কর্মকর্তাকে নিয়ে লিয়াকত আলী লাকী বেশিরভাগ কাজ  সম্পাদন করেন এবং এদের মাধ্যমেই তিনি পরিষদকে না জানিয়ে কর্মসূচি পালন করেন। এই কর্মকর্তারা জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা। বিভিন্ন জেলায় থাকার কথা থাকলেও তারা থাকেন ঢাকায়।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন জেলার ১৫ কর্মকর্তা ঢাকায় বসে আছেন। গত ৭ এপ্রিল ভার্চুয়ালি শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের ১২০তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকায় পদায়নকৃত একাডেমির কালচারাল অফিসারদের কর্মবণ্টন, কর্মপরিধি ও বদলির বিষয়ে পরবর্তী সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সভায় পরিষদের সদস্য রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘মোট ২৪টি জেলায় কালচারাল অফিসার আছেন। ৫টি জেলায় নেই। অনেক জেলার অফিসারকে একাধিক জেলার সঙ্গে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। এতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে।’

যে ১৫ জন ঢাকায় আছেন, তাদের ঢাকায় থাকা জরুরি কিনা সেটি বিশ্লেষণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “জেলাগুলো অবহেলিত থেকে যাচ্ছে। কেবল ঢাকায় ‘রক্ত সঞ্চালন’ করে তো লাভ হবে না।” এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন তিনি।

সভায় অন্য জ্যেষ্ঠ সদস্যরাও এই কর্মকর্তাদের জেলায় পাঠানোর বিষয়ে মত দেন। তাদের মত যথারীতি কানে নেননি ডিজি।

পরিষদ সদস্যদের দাবি, এই কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে ডিজি এমন অবস্থান নিচ্ছেন, যা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।

যারা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মানেনি

মন্ত্রণালয় থেকে বদলি হওয়া ৮ জনের মধ্যে দুজন যোগ দিয়েছেন। বাকি ৬ জন একাডেমির ‘স্বেচ্ছাচারী‘ আদেশ বলে ঢাকাতেই রয়ে গেছেন। যে কর্মকর্তারা নির্দেশ মানেননি তারা হলেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির অর্থ হিসাব ও পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক শহিদুল ইসলাম, সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগের সহকারী পরিচালক খন্দকার ফারহানা রহমান, নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের সহকারী পরিচালক (সিনেমাটোগ্রাফি) চাকলাদার মোস্তফা আল মাহমুদ, অর্থ ও পরিকল্পনা বিভাগের অ্যাকাউন্ট অফিসার মো. আল হেলাল, প্রশাসন বিভাগের কালচারাল অফিসার আসফ উদ-দৌলা, প্রশাসন বিভাগের জনসংযোগ কর্মকর্তা হাসান মাহমুদ। আর বদলি হওয়াদের মধ্যে যে দু'জন নির্দেশনা মেনে যোগ দিয়েছেন তারা হলেন বেগম আফসানা খান জুনা, প্রশাসন বিভাগের সহকারী সচিব এবং নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের লাইট ডিজাইনার মোহাম্মদ এরশাদ হাসান।

রিট ফাইলই আটকে দিলো বদলি!

সভার পর গত ২৪ জুন আট কালচারাল অফিসারকে জেলায় বদলির আদেশ দেয় মন্ত্রণালয়। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রণালয় থেকে বদলির আদেশ দিতে পারে না দাবি করে ওই আট কর্মকর্তার পক্ষে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আইনজীবী আবদুল মতিন সরকার।

এদিকে মন্ত্রণালয়ের বদলির আদেশ বাতিল করে গত ৩০ জুন ওই কর্মকর্তাদের নিজ পদে বহাল থাকার পাল্টা আদেশ দেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী।

বিষয়টি নিয়ে অ্যাডভোকেট তানজীম আল ইসলাম বলেন, যদি কেবল রিট ফাইল হয় এবং তার বিপরীতে কোনও স্থগিতাদেশ না দেওয়া হয় তবে আগ বাড়িয়ে একাডেমির সেটিকে ধর্তব্যে নেওয়ার কারণ নেই।

এ প্রসঙ্গে রিটকারী আইনজীবী আব্দুল মতিন সরকার বলেন, করোনার কারণে হাইকোর্টে জরুরি মামলার শুনানি চলছে। তাই এ সময়ে রিটটির শুনানি পেন্ডিং রয়েছে। নিয়মিত আদালত খুললে রিটটি দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেবো।

একাডেমির পরিষদ সদস্য রামেন্দু মজুমদার বলেন, “সেদিনের সভায় ১০ জন কালচারাল অফিসারকে বদলির ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। সভা থেকে মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ৩০ জুনের মধ্যে সেটা করার কথা। ইতোমধ্যে দুজন সেই আদেশ মেনেছেন। এরমধ্যে ৩০ জুন ‘ভুক্তভোগীর’ রিট আবেদনের কথা উল্লেখ করে মহাপরিচালক একটি অফিস আদেশ দিয়ে সকলকে ঢাকায় থাকতে বলেন।”

রামেন্দু মজুমদার আরও বলেন, ‘রিট আবেদন করলেই সেটি কার্যকর করার কোনও আইনি বিধিবিধান নেই। আমাদের কাছে আদালতের কোনও নির্দেশনাও আসেনি। এ ছাড়া শিল্পকলার বিষয়ে পরিষদের সিদ্ধান্তে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রয়েছে।’

এ ধরনের আদেশের বিষয়ে একাডেমির পরিষদ কোনও উদ্যোগ নিয়েছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই তো মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে।’ মহাপরিচালকের স্বেচ্ছাচারিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একাডেমিতে যত পরিকল্পনা বা যত অনুষ্ঠান হয় তার একটিও পরিষদকে আগে জানানো হয় না। পরিষদ থাকা না থাকা একই ব্যাপার।’

কেন এমন হচ্ছে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘লিয়াকত আলী লাকী যথেষ্ট যোগ্য ব্যক্তি। কিন্তু যেকোনও প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি ১১-১২ বছর সেখানে থাকেন তাহলে তার শেকড় গজিয়ে যায়, স্বেচ্ছাচারিতারও প্রকাশ ঘটে।’

এরইমধ্যে ১৬ জনকে পদায়ন ও বদলির একক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মহাপরিচালক। এমনটা উল্লেখ করে একাধিক পরিষদ সদস্য প্রশ্ন তোলেন, ‘একদিকে কোভিডের সময়ে আট কর্মকর্তা যেন ঢাকায় থাকেন, সেই অফিস আদেশ দিচ্ছেন মহাপরিচালক, আরেক দিকে অন্য কর্মকর্তাদের ঠিকই ঢাকার বাইরে বদলি করে দিচ্ছেন। তা হলে তার যুক্তি খাটলো কী?’

পরিষদের আরেক সদস্য মলয় ভৌমিক বলেন, সেদিনের পরিষদ সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে ১০ জনকে বদলি করা হবে। সেটি স্থগিত করতে হলে পরিষদের সিদ্ধান্তে সেটি হতে হবে। তিনি বলেন, পরিষদ নিজেই অন্ধকারে রয়েছে। গণমাধ্যমে এসব দেখে আমরা বিব্রতও। দ্রুত পরিষদের জরুরি সভা ডাকা হোক।

এসব বিষয়ে জানতে লিয়াকত আলী লাকীকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে এসএমএসে বিষয়টি জানানো হলেও তার জবাব পাওয়া যায়নি।

তথ্য সুত্রঃবাংলা ট্রিবিউন

;